‘লালন দেহতত্ত্ব’ সমাজে কতটা প্রাসঙ্গিক?

 

||রাহেল ইসলাম| | ১৭ অক্টোবর ছিল ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস। ১৮৯০ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিনি দেহত্যাগ করেন। তাঁর ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে চলতি বছরের ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব ও মেলার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত, সাধক, শিল্পী, গবেষক ও দর্শনার্থীরা সমবেত হন তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ধামে। লালনের গান, সাধুসঙ্গ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে আবারও স্মরণ করা হয়েছে বাংলার এই ব্যতিক্রমী সাধককে।

কিন্তু এই স্মরণোৎসবের বিষয়েই একটি প্রশ্ন নতুন করে তোলা দরকার: যে মানুষটি ১৩৬ বছর আগে দেহত্যাগ করেছেন, তাঁর দেহ, জীবন ও মানুষ সম্পর্কে চিন্তা আজকের জীবিত মানুষের সমাজে কতটা প্রাসঙ্গিক?

আমরা লালনকে স্মরণ করছি, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোকে কতটা নিজেদের জীবনে গ্রহণ করছি? তাঁর গান গাইছি, অথচ জাতপাতের বিভাজন থেকে মুক্ত হতে পারছি কি? তাঁর মানবিকতার কথা বলছি, অথচ শ্রমিকের দেহ, নারীর স্বাধীনতা, শিশুর শৈশব কিংবা দরিদ্র মানুষের জীবনের অবকাশ নিয়ে কতটা ভাবছি? তাঁর নামে মেলা বসছে, অথচ আমাদের সমাজে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার সংকট কতটা কাটছে?

মৃত্যুবার্ষিকী কেবল মৃত একজন সাধককে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়। এটি জীবিত মানুষের জীবনকে পরীক্ষা করারও উপলক্ষ বটে। লালনের তিরোধান আমাদের তাঁর অনুপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়; আর তাঁর দেহী মানুষের ভাবনা আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায়: আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তারা আসলে কতটা বেঁচে আছি?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে লালনকে শুধু বাউল সংগীতের মহান রচয়িতা কিংবা বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় প্রতীক হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁর দেহ, মানুষ, জাত-পাত, প্রেম, গুরু ও আত্মপরিচয় বিষয়ক ভাবনাকে বৃহত্তর দার্শনিক ও সামাজিক পরিসরে পাঠ করতে হবে।

কারণ লালনের দেহতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা কেবল অতীতের কোনো সাধনাপদ্ধতিতে নয়; মানুষের অস্তিত্ব, সামাজিক সম্পর্ক ও মুক্ত জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর মধ্যেও নিহিত।

দেহ ছাড়া মানুষ কোথায়?

দেহ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা অনেক সময় দেহতত্ত্বকে রহস্যময় কোনো সাধনা, গুপ্ত যৌনাচার কিংবা শরীরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিশেষ কোনো সত্যের অনুসন্ধান হিসেবে বুঝে থাকি। কিন্তু লালনের দেহী মানুষের ভাবনাকে কেবল এই সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করলে তাঁর চিন্তার মৌলিকতা হারিয়ে যায়।

এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: দেহকে একটি তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা আর দেহী মানুষকে অস্তিত্বের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকার করা এক কথা নয়।

মানুষ দেখে দেহ দিয়ে, শোনে দেহ দিয়ে, স্পর্শ করে দেহ দিয়ে, অনুভব করে দেহ দিয়ে। সে ভালোবাসে, কষ্ট পায়, আনন্দিত হয়, স্মৃতি বহন করে এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে তার দেহী অস্তিত্বের মধ্য দিয়েই। মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিসত্তা ও পৃথিবীকে জানার প্রক্রিয়া দেহের বাইরে কোনো বিমূর্ত শূন্যতায় সংঘটিত হয় না।

তাহলে দেহকে বাদ দিয়ে মানুষকে বোঝার চেষ্টা কেন?

দেহের বাইরে কোনো আত্মিক সত্তার অস্তিত্ব আছে কি না, তা ধর্ম ও দর্শনের পৃথক প্রশ্ন। কিন্তু সামাজিকভাবে জীবিত মানুষকে বুঝতে গেলে তার দেহী অস্তিত্বকে উপেক্ষা করা যায় না। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য, অসুস্থ মানুষের কাছে চিকিৎসা, নির্যাতিত মানুষের কাছে নিরাপত্তা এবং নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে সম্পর্ক কোনো বিমূর্ত আধ্যাত্মিক ধারণা নয়। এগুলো তার জীবনের বাস্তব শর্ত।

লালনের দেহী মানুষের প্রশ্নকে এই জায়গা থেকে পড়লে বোঝা যায়, মানুষকে তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মুক্তির কথা বলার মধ্যে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। যে মানুষ দেহের মাধ্যমে জীবন অনুভব করে, তার দেহের বাস্তবতা অস্বীকার করে তাকে পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

লালনের বহুল পরিচিত গান “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” এই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়। তবে গানটির অর্থকে শুধু দেহকে পরিত্যাজ্য খাঁচা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার বহুমাত্রিকতা সংকুচিত হয়। এখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বের রহস্য, সীমাবদ্ধতা এবং নিজেকে জানার অসম্পূর্ণতার মুখোমুখি হয়।

দেহ একই সঙ্গে জীবনযাপনের ক্ষেত্র, উপলব্ধির মাধ্যম এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানের জায়গা। এই দৃষ্টিতে লালনের দেহতত্ত্বের প্রথম প্রাসঙ্গিকতা হলো, মানুষকে কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, পেশা কিংবা উৎপাদনক্ষমতা দিয়ে বিচার না করে জীবন্ত মানুষ হিসেবে স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা।

জাতের প্রশ্নই সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন

“সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে” — লালনের এই প্রশ্ন আজও আমাদের সামাজিক বিবেককে অস্বস্তিতে ফেলে।

মানুষ জন্মগ্রহণ করে একটি দেহ নিয়ে। কিন্তু জন্মের পর সমাজ তার পরিচয়ের সঙ্গে নানা শ্রেণিবিভাগ জুড়ে দেয়। কেউ উচ্চবর্ণ, কেউ নিম্নবর্ণ; কেউ অভিজাত, কেউ প্রান্তিক; কেউ সম্মানিত, কেউ অবহেলিত। ধর্ম, বংশ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে এমন দেয়াল তৈরি হয়, যেন এই বিভাজনগুলো প্রকৃতির অনিবার্য বিধান। অথচ কোনো মানুষের জন্মপরিচয় তার মানবিক মর্যাদার চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না।

বাংলাদেশে জাতপাতের ঐতিহাসিক প্রভাব, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য, শ্রেণিগত অবজ্ঞা, পেশাভিত্তিক অসম্মান এবং বংশমর্যাদার অহংকারের নানা প্রকাশ এখনো দেখা যায়। মানুষকে তার মানবিক গুণাবলি দিয়ে মূল্যায়ন করার বদলে তার পরিচয়ের ঘরে আটকে রাখার প্রবণতা রয়ে গেছে। লালনের জাতপ্রশ্ন এই বিভাজনের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করতে সাহায্য করে।

তবে দেহী মানুষের সমতার কথা বলার অর্থ এই নয় যে সবার দেহ, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থান এক। শ্রেণি, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা, পুষ্টি, চিকিৎসা ও জীবিকার বৈষম্য মানুষের শরীর ও জীবনকে বাস্তবভাবেই ভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেলে। সমতার অর্থ এই পার্থক্যগুলো অস্বীকার করা নয়; বরং কোনো পার্থক্যকে মানুষের সহজাত শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা হীনতার যুক্তি হতে না দেওয়া।

লালনকে শুধু অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে তাঁর প্রশ্নের সামাজিক ধার কমে যায়। তাঁর জাতপ্রশ্নকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে দেখতে হবে, আমরা শ্রমজীবী মানুষকে কীভাবে দেখি, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে দূরে সরিয়ে দিই কি না, দরিদ্র মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন এবং সামাজিক ক্ষমতার অসম বণ্টনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই কি না।

যে সমাজ লালনের গান গায়, অথচ মানুষের জন্মপরিচয় দিয়ে তার মর্যাদা নির্ধারণ করে, সেই সমাজের লালনচর্চায় মৌলিক অসংগতি রয়েছে।

মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু জীবন কতটা জীবিত?

মৃত্যু বলতে আমরা সাধারণত জীবনের জৈবিক সমাপ্তিকে বুঝি। কিন্তু সামাজিক জীবনে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়, যেখানে মানুষ শ্বাস নেয়, কাজ করে, চলাফেরা করে, অথচ তার জীবনের সৃষ্টিশীল ও মানবিক সম্ভাবনাগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে।

একজন মানুষ প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছেন, উপার্জন করছেন, সংসারের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর আয় হয়তো বেড়েছে, সামাজিক মর্যাদাও বেড়েছে। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবকাশ পান না, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন না, নিজের আগ্রহের কাজ করতে পারেন না। প্রতিদিনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নিজের জীবনের আনন্দ, কৌতূহল ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলছেন।

জীবনের কতখানি নিজের?

এখানে নর্মান ও. ব্রাউনের “লাইফ অ্যাগেইনস্ট ডেইথ” বইয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সংলাপ তৈরি করা যায়। ব্রাউন ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের আলোকে সভ্যতার দমনমূলক প্রবণতা, অপরাধবোধ, দেহের আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুভয়ের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর চিন্তার একটি কেন্দ্রীয় উদ্বেগ হলো, মৃত্যুকে ভয় করতে করতে মানুষ এমন জীবনব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারে, যেখানে জীবনের স্বাভাবিক শক্তিগুলোই দমিত হয়ে পড়ে।

ব্রাউনের চিন্তা ও লালনের সাধনাজগত এক নয়। তাঁদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পরিভাষা এবং দার্শনিক ভিত্তিও আলাদা। কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি পাঠ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার নামে আমরা কি এমন সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষের জীবিত থাকার অর্থই ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় খুঁজতে হবে। কেউ বেকারত্বের ভয়ে দিন কাটান, কেউ ঋণের চাপে, কেউ পরিবারের প্রত্যাশার ভারে, কেউ কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তায়। কেউ সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য নিজের সমস্ত সময় ব্যয় করেন; কেউ সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য নিজের ইচ্ছাকে প্রতিনিয়ত দমন করেন।

এসব পরিস্থিতির সবগুলোকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো অর্থনীতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। লালনের দেহী মানুষের ভাবনা থেকে তাই প্রশ্ন উঠতে পারে: সমাজের উদ্দেশ্য কি কেবল মানুষকে টিকিয়ে রাখা, নাকি তাকে মর্যাদা, সম্পর্ক, স্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়া?

পুঁজিবাদী সমাজে দেহ: শ্রমের উপকরণ, নাকি জীবন্ত মানুষ?

আধুনিক অর্থনীতিতে মানুষের শ্রম অপরিহার্য। কিন্তু শ্রম যখন মানুষের জীবনধারণের একটি মাধ্যম না থেকে তার সমস্ত অস্তিত্বের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন সংকট তৈরি হয়।

মানুষ কাজ করে বাঁচার জন্য। অথচ কখনো কখনো কাজের চাপে বেঁচে থাকার সময়টুকুই হারিয়ে ফেলে। একজন শ্রমিক দীর্ঘ সময় কাজ করেন, কিন্তু তাঁর মজুরি পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হয় না। একজন পরিবহনকর্মী জীবিকার প্রয়োজনে ক্লান্ত শরীর নিয়েও রাস্তায় থাকেন। একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, অথচ ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা তাঁকে ঘিরে রাখে। অনানুষ্ঠানিক খাতের বহু মানুষ অসুস্থ হলে কাজ বন্ধ করার সামর্থ্যও পান না।

তাঁদের দেহ অর্থনীতিকে সচল রাখে। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তাঁদের দেহের ক্লান্তি, বিশ্রাম ও নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পায়? এখানে দেহী মানুষের প্রশ্নটি সরাসরি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

শ্রমিকের দেহ কি কেবল উৎপাদনের উপকরণ? তার সময় কি শুধু নিয়োগকর্তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের জন্য? তার স্বাস্থ্য, পারিবারিক জীবন, বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার কি কোনো সামাজিক মূল্য নেই?

লালনকে আধুনিক শ্রম অর্থনীতির তাত্ত্বিক বলা যাবে না। আবার তাঁর ভাবচর্চার মধ্যে সমকালীন শ্রমবাজারের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁর মানবকেন্দ্রিক দেহভাবনা থেকে একটি নৈতিক প্রশ্ন তোলা যায়: কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে মানুষকেই যদি অবহেলা করা হয়, তবে সেই ব্যবস্থার সাফল্যের অর্থ কী?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্যক্তিগত সহানুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসার অধিকার, বিশ্রামের সুযোগ এবং শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।

একইভাবে, কৃষকের উৎপাদনকে শুধু বাজারমূল্যে বিচার করলে তার মাটি, প্রকৃতি, জীবিকা ও সামাজিক সম্পর্কের মূল্য অদৃশ্য হয়ে যায়। গৃহস্থালি ও যত্নের শ্রমকে অর্থনৈতিক হিসাবের বাইরে রাখলে সমাজকে টিকিয়ে রাখার বিপুল কাজও আড়ালে পড়ে যায়। তাই দেহী মানুষের মর্যাদা স্বীকার করার অর্থ মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব শর্তগুলোর প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়া।

শিক্ষা: শিশুকে মানুষ করা, নাকি প্রতিযোগী তৈরি করা?

অনুরূপভাবে, শিশুর পৃথিবীকে চেনার প্রথম মাধ্যম তার দেহ। সে স্পর্শ করে, দেখে, শোনে, দৌড়ায়, প্রশ্ন করে, ভুল করে, আবার চেষ্টা করে। তার জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় জন্মায় না; জন্মায় মানুষ, প্রকৃতি, বস্তু ও পরিবেশের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্কের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ শিশুকে পরীক্ষা, সনদ এবং ভবিষ্যৎ চাকরির প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অভিভাবকের প্রত্যাশা, সামাজিক মর্যাদার চাপ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা শিক্ষাকে প্রায়ই সাফল্য অর্জনের দৌড়ে পরিণত করে।

ছোট শিশুর কাঁধে বইয়ের ভার, দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনা, পরীক্ষার চাপ এবং অন্যের সঙ্গে অবিরাম তুলনা আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা?

পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার নামে যদি শিশুর কৌতূহল, খেলাধুলা, শারীরিক বিকাশ, মানসিক স্বস্তি এবং স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্যকে নতুন করে বিচার করতে হবে।

শিশুকে আমরা ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে দেখি, কিন্তু বর্তমানের মানুষ হিসেবে কতটা স্বীকার করি? তার শৈশব কি শুধু বড় হওয়ার প্রস্তুতি? তার খেলা কি পড়াশোনার ফাঁকে পাওয়া সময়ের অপচয়? তার আনন্দের কি নিজস্ব মূল্য নেই?

লালনের দেহী মানুষের ভাবনা থেকে শিক্ষা সম্পর্কে একটি বিকল্প প্রশ্ন তোলা যায়। শিক্ষা কি মানুষকে নিজের অস্তিত্ব, অন্য মানুষের মর্যাদা এবং পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করছে?নাকি তাকে কেবল বিদ্যমান সামাজিক ছাঁচে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে?

একটি মানবিক শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংগীত, শিল্প, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং সহযোগিতামূলক জীবনচর্চা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। লালন সরাসরি কোনো আধুনিক শিক্ষানীতির কথা উত্থাপন করে যাননি। কিন্তু মানুষকে ছাঁচে ঢালার বদলে মানুষ হিসেবে বিকশিত করার প্রশ্নটি তাঁর দেহী মানুষের ভাবনার সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপ তৈরি করে।

প্রেম, কামনা ও দেহের স্বাধীনতা

দেহী মানুষের আলোচনায় প্রেম ও কামনার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ মানুষের দেহ শুধু শ্রমের বাহন নয়; এটি অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, ঘনিষ্ঠতা, আনন্দ ও সম্পর্কেরও ক্ষেত্র।

সমাজে দেহকে ঘিরে দুটি পরস্পরবিরোধী প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে দেহ ও যৌনতাকে লজ্জা, ভয় ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয় বানানো হয়। অন্যদিকে বাজার দেহকে পণ্য, আকর্ষণের উপকরণ এবং ভোগের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করে।

প্রথম প্রবণতায় মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে অপরাধের মতো দেখা হতে পারে। দ্বিতীয় প্রবণতায় মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীন সম্মতির চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং ভোগের মূল্য বড় হয়ে উঠতে পারে।

দুই ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের দেহ সম্পর্কে স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সচেতন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হারাতে পারে। লালনের প্রেমভাবনা ও দেহকেন্দ্রিক সাধনার ভাষা এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়। তবে তাঁর গানের প্রতিটি দেহসংকেতকে সরাসরি আধুনিক যৌনতার ধারণায় অনুবাদ করাও ঠিক হবে না। তাঁর ভাবভাষার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাধনাগত পরিসর রয়েছে।

তবু তাঁর মানুষ-অনুসন্ধান ও প্রেমের আকাঙ্ক্ষা আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়: মানুষকে শুধু বাহ্যিক পরিচয় কিংবা ভোগের বস্তু হিসেবে দেখলে সম্পর্কের গভীরতা নষ্ট হয়। প্রেম মালিকানার বস্তু নয়। ভালোবাসা মানে অন্য মানুষের ওপর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়। বিবাহ কিংবা পারিবারিক সম্পর্কও কারও দেহ, ইচ্ছা ও ব্যক্তিসত্তার ওপর সীমাহীন মালিকানা দেয় না।

একটি মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সম্মতি, আস্থা, যত্ন এবং দায়িত্ব। নিজের দেহের মর্যাদা স্বীকার করার অর্থ অন্য মানুষের দেহী স্বাধীনতার মর্যাদাও স্বীকার করা। এই প্রশ্নের সঙ্গে নারী-পুরুষের সমতা, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান, নারীর নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার সরাসরি যুক্ত।

যে সমাজ প্রেমের কথা বলে, অথচ মানুষের সম্মতি অস্বীকার করে, সে সমাজের প্রেমের ধারণাকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। যে সমাজ নৈতিকতার কথা বলে, অথচ অপমান ও নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেয়, তার নৈতিকতার ভিত্তিও পরীক্ষা করা দরকার।

নারীদেহ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ

দেহের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নারীর অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারীর পোশাক, চলাফেরা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, বিবাহ এবং সামাজিক উপস্থিতি নিয়ে পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বাজারের নানা ধরনের প্রত্যাশা কাজ করে।

সব সামাজিক রীতি একই রকম নয়, সব ধর্মীয় অনুশীলনও নিপীড়নের সমার্থক নয়। মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পছন্দের মর্যাদা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো পরিচয়ের নামে জবরদস্তি ও সহিংসতাকে প্রশ্ন করাও জরুরি।

মূল প্রশ্ন হলো, নারী কি নিজের জীবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারসম্পন্ন পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃত? নাকি তাকে পরিবারের সম্মান, পুরুষের কর্তৃত্ব, সামাজিক রীতি কিংবা বাজারের সৌন্দর্য-আদর্শের বাহক হিসেবে দেখা হয়?

নারীর শ্রমের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। ঘরের কাজ, সন্তান পালন, অসুস্থ মানুষের যত্ন এবং পরিবারের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় নারীর অবদান সমাজকে সচল রাখে। অথচ এই শ্রমের বড় অংশের সরাসরি মজুরি নেই এবং সামাজিক স্বীকৃতিও প্রায়ই অপর্যাপ্ত। দেহী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দাবি তোলে: যে মানুষ শ্রম করে, যত্ন দেয়, কষ্ট সহ্য করে এবং জীবনকে টিকিয়ে রাখে, তার শ্রম ও মর্যাদা অস্বীকার করা যায় না।

এ কারণে লালনকে সমকালীন নারীবাদের পূর্ণাঙ্গ প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসসম্মত হবে না। কিন্তু তাঁর মানুষের পরিচয়সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোকে ব্যবহার করে আমরা এমন সামাজিক কাঠামোর সমালোচনা করতে পারি, যা নারীকে পূর্ণ মানবিক কর্তা হিসেবে স্বীকার করতে দ্বিধা করে। এখানে লালনের প্রাসঙ্গিকতা কোনো প্রস্তুত সমাধানে নয়; বরং সমাজের প্রচলিত ক্ষমতাসম্পর্ককে প্রশ্ন করার সুযোগে।

 ধর্মীয় পরিচয় ও মানুষের মর্যাদা

লালনের ভাবজগতে ধর্মীয় ভাষা, ফকিরি-মুর্শিদি পরিসর, মানুষ-অনুসন্ধান এবং জাতপাতবিরোধী প্রশ্নের বহুমাত্রিক উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর চিন্তাকে কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ আবদ্ধ করা যেমন সমস্যাজনক, তেমনি তাঁর ঐতিহাসিক ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার ও সাধনাগত পরিসরকে অস্বীকার করাও ভুল।

বাংলার ভাবচর্চার ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ধারার সংলাপ, সংঘাত এবং আদান-প্রদানের ভূমিকা রয়েছে। লালনের গান সেই জটিল ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমকালীন সমাজে ধর্মীয় পরিচয় কখনো কখনো মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কে কোন ধর্মের, কার উপাসনাপদ্ধতি কেমন, কে কোন সম্প্রদায়ের-এসব প্রশ্নের ভিত্তিতে মানুষের প্রতি আচরণ নির্ধারণ করা হয়।

ধর্ম মানুষের জীবনে গভীর অর্থ বহন করতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য যখন অন্য মানুষের মর্যাদা অস্বীকার করার উপায় হয়ে ওঠে, তখন তার সামাজিক পরিণতি বিচার করা প্রয়োজন।

একইভাবে, লালনকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের মুখপাত্র বানিয়ে তাঁর বহুমাত্রিক ভাবজগতকে সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। লালনকে সম্মান করার অর্থ তাঁকে নিজেদের মতাদর্শের অনুগত প্রতীক বানানো নয়। বরং তাঁর গান ও সাধনার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিশ্বাস, আচরণ এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোকে পরীক্ষা করা।

প্রকৃতি, পরিবেশ ও দেহী অস্তিত্ব

মানুষের দেহকে সমাজের মধ্যে বুঝতে গেলে প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কও বিবেচনা করতে হবে। মানুষ বাতাস ছাড়া শ্বাস নিতে পারে না, পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, খাদ্য ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। অথচ আধুনিক উন্নয়নের বহু প্রকল্পে প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ, জমি কিংবা উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়।

নদী দূষিত হয়, কৃষিজমি কমে, বন উজাড় হয়, বাতাস দূষিত হয়, তাপমাত্রা বাড়ে। এর ফল শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সামাজিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের নদীমাতৃক সমাজে এই সংকট আরও গভীর। নদীভাঙন মানুষের বসতি কেড়ে নেয়, দূষণ স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে বিপন্ন করে, জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি ও উপকূলীয় জীবনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

লালনের দেহী মানুষের ভাবনা থেকে এখানে একটি প্রশ্ন তোলা যায়: মানুষ কি প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীন কোনো সত্তা, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই তার জীবন গড়ে ওঠে? লালনকে সরাসরি আধুনিক পরিবেশবাদের পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক বলা যাবে না। কিন্তু মানুষকে বিমূর্ত আত্মা কিংবা নিছক উৎপাদনযন্ত্র হিসেবে না দেখে তার বাস্তব, সংবেদনশীল ও নির্ভরশীল অস্তিত্বকে স্বীকার করলে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পায়।

মানুষের দেহের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তার বাসযোগ্য পরিবেশও রক্ষা করতে হবে। নদী, মাটি, বন ও বাতাসকে ধ্বংস করে মানুষের কল্যাণের দাবি শেষ পর্যন্ত নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে।

লালন মেলা, প্রতিকৃতি ও রাষ্ট্রীয় স্মৃতির রাজনীতি

লালন মেলা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এখানে গান হয়, সাধুসঙ্গ হয়, মানুষের মিলন ঘটে, স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয়। এসবের মূল্য অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু উৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি প্রশ্ন করতে হবে, লালনকে কীভাবে স্মরণ করা হচ্ছে এবং তাঁর ভাবচর্চাকে কোন ভাষায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।

লালনের চেহারা নিয়ে ঐতিহাসিক অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাঁর জীবদ্দশার বলে প্রচলিত কিছু চিত্র এবং পরবর্তী সময়ে আঁকা কল্পিত বা পুনর্গঠিত প্রতিকৃতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। নন্দলাল বসুর নামে প্রচলিত লালন-প্রতিকৃতিকে এই প্রেক্ষাপটে সতর্কতার সঙ্গে বিচার করতে হবে। কোনো শিল্পকর্মের নান্দনিক মূল্য থাকা এবং সেটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত প্রতিকৃতি হওয়া এক বিষয় নয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন কোনো ছবিকে লালনের নিশ্চিত মুখ হিসেবে প্রচার করে, তখন সেই ছবির মাধ্যমে মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অথচ প্রমাণ অনিশ্চিত হলে সেই অনিশ্চয়তাকে প্রকাশ করাই ইতিহাসচর্চার সততা। এখানে সমালোচনার লক্ষ্য কোনো শিল্পীকে হেয় করা নয়। লক্ষ্য হলো শিল্প, ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা।

একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, প্রতিকৃতি নিজেই সাধনাবিরোধী কিংবা ক্ষতিকর-এমন সর্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিকৃতি স্মৃতি, শিল্প, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনো প্রতীককে ইতিহাসের একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, অথবা সেই প্রতীকের মাধ্যমে সাধকের ভাবজগতকে সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছ সাংস্কৃতিক নীতি, নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গবেষণা এবং জনসাধারণের কাছে তথ্যের যথাযথ উপস্থাপন। লালনকে স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় শুধু তাঁর মুখ দৃশ্যমান করা নয়; তাঁর প্রশ্নগুলোকে সামাজিকভাবে দৃশ্যমান করা।

লালনকে উৎসব থেকে জীবনে ফিরিয়ে আনা

লালনকে নিয়ে গান হয়, মেলা হয়, আলোচনা হয়, গবেষণা হয়, পর্যটন গড়ে ওঠে। এসব আয়োজনের সাংস্কৃতিক মূল্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এই আয়োজনগুলোর সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের সম্পর্ক কতটা?

যে সমাজে মানুষকে জাতপাতের নামে অপমান করা হয়, সেখানে লালনের জাতপ্রশ্ন কতটা জীবিত? যে সমাজে শ্রমিকের শরীরকে অবহেলা করা হয়, সেখানে দেহী মানুষের মর্যাদা কতটা স্বীকৃত? যে সমাজে নারীর সম্মতি উপেক্ষিত হয়, সেখানে প্রেম ও মানবিক সম্পর্কের ভাষা কতটা কার্যকর? যে সমাজে শিশুর শৈশব প্রতিযোগিতার চাপে সংকুচিত হয়, সেখানে মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের প্রশ্ন কতটা গুরুত্ব পায়?

লালনকে উৎসবের মঞ্চে সম্মান জানিয়ে যদি আমরা বাস্তব জীবনে তাঁর প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাই, তাহলে তাঁর স্মরণ সাংস্কৃতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

লালনকে জীবনে ফিরিয়ে আনার অর্থ তাঁর নামে নতুন কোনো মতাদর্শিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং তাঁর গান ও ভাবচর্চার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের অসংগতি শনাক্ত করা।

এর জন্য প্রয়োজন তাঁর গানকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পাঠ করা, তাঁর ভাবজগতের বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে মুক্ত আলোচনা করা, প্রচলিত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা এবং তাঁর চিন্তার সঙ্গে সমকালীন সমাজের প্রশ্নগুলোর সংলাপ তৈরি করা।

শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন গবেষণা। শুধু শ্রদ্ধা নয়, প্রয়োজন সমালোচনামূলক উপলব্ধি। শুধু প্রতীক নয়, প্রয়োজন সামাজিক অনুশীলন।

লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে জীবনের হিসাব

লালন শাহের তিরোধান দিবসে তাঁর জীবন ও সাধনাকে স্মরণ করা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। কিন্তু এই স্মরণকে আরও অর্থপূর্ণ করে তুলতে হলে তাঁর মৃত্যুর তারিখের পাশাপাশি তাঁর জীবনের প্রশ্নগুলোও আমাদের সামনে রাখতে হবে।

আমরা কি মানুষকে তার জন্মপরিচয়ের বাইরে মানুষ হিসেবে দেখতে পারি? আমরা কি শ্রমের মর্যাদা দিতে পারি? আমরা কি শিশুকে শুধু ভবিষ্যতের প্রতিযোগী না ভেবে বর্তমানের জীবন্ত মানুষ হিসেবে স্বীকার করতে পারি? আমরা কি নারীর দেহী স্বাধীনতা ও সম্মতির মর্যাদা দিতে পারি? আমরা কি প্রকৃতিকে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য শর্ত হিসেবে দেখতে পারি? আমরা কি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের হাতিয়ার না বানিয়ে মুক্ত অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে রক্ষা করতে পারি? এসব প্রশ্নের উত্তরেই লালনের প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারিত হবে।

দেহ নশ্বর। মানুষের জীবন সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা মানুষকে অপমান করার কারণ নয়; বরং তার জীবন, সময়, সম্পর্ক ও মর্যাদার গুরুত্ব বোঝার উপলক্ষ। মানুষ একদিন মারা যাবে বলেই তার জীবনের প্রতিটি অবমাননা, অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এবং অসম্ভব হয়ে ওঠা আনন্দের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুকে অস্বীকার করে জীবনকে রক্ষা করা যায় না। আবার জীবনের অনিবার্য সমাপ্তির কথা বলে মানুষের বর্তমান কষ্টকেও তুচ্ছ করা যায় না। মানুষের হাতে যে সীমিত সময় আছে, সেই সময়ে সে কতটা স্বাধীন, কতটা নিরাপদ, কতটা সৃষ্টিশীল এবং কতটা মানবিকভাবে বাঁচতে পারছে-এই প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লালনের দেহী মানুষের ভাবনা আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

সমাজ যদি মানুষের দেহকে শুধু শ্রমের উপকরণ, পরিচয়ের বাহক, ভোগের বস্তু কিংবা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে, তাহলে সেই সমাজের মুক্তির দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মানুষের দেহী অস্তিত্বকে স্বীকার করার অর্থ হলো তার অনুভূতি, স্বাধীনতা, শ্রম, প্রেম, বিশ্রাম, সম্পর্ক এবং মর্যাদাকে সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে স্থান দেওয়া।

লালনকে সত্যিকার অর্থে প্রাসঙ্গিক করে তোলার কাজ তাই তাঁকে শুধু স্মরণ করা নয়; তাঁর প্রশ্নগুলোকে নিজেদের জীবনের মধ্যে ফিরিয়ে আনা। প্রতি বছর লালনের তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ায় মানুষ সমবেত হবে, গান গাইবে, সাধুসঙ্গে অংশ নেবে। কিন্তু সেই আয়োজনের বাইরে, আমাদের কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পরিবারে, রাজনীতিতে এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে তাঁর মানুষ কতটা জায়গা পাবে?

লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত শুধু-লালন কী রেখে গেছেন? প্রশ্নটি আরও হওয়া দরকার-লালনের মানুষকে চিনতে গিয়ে আমরা নিজেদের মানুষ হিসেবে কতটা চিনতে শিখেছি? কারণ লালনের দেহতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা শেষ পর্যন্ত তাঁর অতীতের মহিমায় নয়; বর্তমানের মানুষকে কতটা জীবিত, স্বাধীন ও মর্যাদাবান করে তুলতে পারি, তার মধ্যেই নিহিত। তাই লালনকে স্মরণ করার চূড়ান্ত পরীক্ষা মেলার জনসমাগমে নয়, মানুষের জীবনে।

[লেখক: স্নাতক তৃতীয় বর্ষ শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উনো রিভার্স আর বুঁদ হওয়া ঘুমের কাব্য

ডেসপিক্যাবল ম্যাটার

আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা জরুরি যে কারণে