দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিজম যে কারণে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে!

 

নুসরাত নূর ই আফরিন ঋতু | এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শোষণমুক্ত সমাজ, শ্রমিকের অধিকার ও অর্থনৈতিক সাম্যের প্রতীক ছিল লাল পতাকা। কৃষক শ্রমিকের আন্দোলন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সর্বত্রই বামপন্থী রাজনীতি মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে। তবে, এখন সময়ের সঙ্গে বদলেছে। সাথে বদলেছে রাজনীতির ভাষা, অর্থনীতির ধরন এবং মানুষের আশা-প্রত্যাশাও।

এ কারণে, প্রশ্ন উঠছে: সাম্প্রতিক সময়ে কমিউনিজম কি দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমে ক্রমে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে, নাকি নতুন বাস্তবতায় নিজেকে বদলে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে এই আদর্শ?

 উত্তর খুঁজতে হলে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকাতে হবে।ভারতে বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছর বামফ্রন্ট শাসন করেছে। এরপর রাজ্যটিতে বাম দলগুলোর নির্বাচনী প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ বিধানসভার নির্বাচনে সিপিআই(এম) শুধুমাত্র ১টি আসন পেয়েছে জোটসহযোগে সর্বমোট ২টি।

 তবে কেরালায় ভিন্ন রুপ দেখা যায়।কেরালায় বামদের রাজনীতির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভারতের সব অঞ্চলে বাম রাজনীতির বাস্তবতা এক নয়। একই দেশে কোথাও বামপন্থীরা সংকটে আবার কোথাও কোথাও তারা এখনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বিকাশ ঘটেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কৃষক শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং পাকিস্তানি শাসনামলের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।বাংলাদেশেও বাম দলগুলো শ্রমিকের অধিকার, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভূমিকা রেখে আসছে। তাদের জোরালো ঐতিহাসিক অবদান রয়েছে।

কিন্তু তাদের বর্তমানের অবস্থা এবং অবদান পুর্বের তুলনায় ম্লান হয়ে এসেছে। শ্রমিকের মজুরি, দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব ও সম্পদের অসম বণ্টনের মতো সমস্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ  ইস্যুতে সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া এবং সেই সমর্থন কে শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তিতে রূপ দেওয়া বাম দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

❝ বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম সংকট হলো সাংগঠনিক বিভক্তি ও নির্বাচনী জনসমর্থনের সীমাবদ্ধতা। বিভিন্ন দল আদর্শগতভাবে কাছাকাছি হলেও নেতৃত্ব, কৌশল ও জোটের প্রশ্নে একমত হতে পারেনি।এ ছাড়া বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব, শ্রমিক-কৃষকের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগের দুর্বলতা এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদের বক্তব্য কার্যকরভাবে পৌঁছাতে না পারা তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করেছে।❞

নেপালের আবার ভিন্ন রুপ দেখা যায়।রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল নেপালের কমিউনিস্ট শক্তিগুলো। পরবর্তী সময়ে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংসদীয় রাজনীতির অংশ হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় অংশগ্রহণের পরও জনআস্থা ধরে রাখা যে সহজ নয়, দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন তা সামনে এনেছে। 

অন্যদিকে, পাকিস্তানে বামপন্থী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নানা বাধার মুখে থাকলেও শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

শ্রীলঙ্কার ২০২৪ সালের নির্বাচনে বামপন্থী ঐতিহ্যসম্পন্ন জনতা বিমুক্তি পেরামুনার নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার জোটের বড় বিজয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এটি দেখায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বামঘেঁষা রাজনীতির সম্ভাবনা সব দেশে একইভাবে সংকুচিত হয়নি। তবে এই সাফল্যকে কমিউনিজমের সরাসরি পুনরুত্থান বলা যাবে না। এর পেছনে দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব, অর্থনৈতিক সংকট ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাহলে বাম রাজনীতির সংকট কোথায়?

 এর উত্তর শুধু কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা, পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলের ওপর নির্ভরতা এবং তরুণদের সঙ্গে দূরত্ব সংকটকে গভীর করেছে। একসময় বড় কারখানার শ্রমিক ছিল বাম রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, ফ্রিল্যান্সিং, প্ল্যাটফর্মনির্ভর কাজ ও অভিবাসী শ্রমের বাস্তবতায় শ্রমিকের পরিচয় ও সমস্যা বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো জরুরি।

অন্যদিকে, কমিউনিজমের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, শ্রমিকের অধিকার এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অসম সুযোগের সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। ফলে বামপন্থী রাজনীতির সামনে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব সমস্যার অস্তিত্বই যে কমিউনিস্ট দলগুলোর প্রতি জনসমর্থন বাড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য শুধু বৈষম্যের সমালোচনা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কর্মসূচি, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং কার্যকর সংগঠন।তাছাড়া  নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে বুঝার চেষ্টা করতে হবে । তরুণেরা শুধু শ্রেণিবৈষম্য নয়, কর্মসংস্থান, ব্যক্তিস্বাধীনতা, পরিবেশ, দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়েও ভাবছে। বামপন্থী রাজনীতি যদি এসব প্রশ্নকে নিজেদের কর্মসূচির অংশ করতে পারে, তাহলে নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু অতীতের সাফল্যকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানের পরিবর্তন উপেক্ষা করলে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ তাই এক কথায় নির্ধারণ সম্ভব নয়। বাম দলগুলো কোথাও কোথাও নির্বাচনী সংকটে ভুগছে , কোথাও তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, আবার কোথাও বামঘেঁষা শক্তি নতুন সমর্থন পেয়েছে। এই বৈচিত্র্যতাই বলে দেয় কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।লাল পতাকা হয়তো আগের মতো সবজায়গায়  দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু যে বৈষম্য, শোষণ ও সামাজিক অবিচারকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেগুলো এখনো দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতার অংশ।তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সেই পুরোনো আদর্শ নতুন সময়ের ভাষা খুঁজে পেতে সমর্থ কিনা। কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ শুধু তার ইতিহাসের ওপর নয়, বর্তমানের মানুষের জীবনে কতটা অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করবে।

লেখক: স্নাতক তৃতীয় বর্ষ শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

[লেখাটি ১৮ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক ‘রূপালী বাংলাদেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উনো রিভার্স আর বুঁদ হওয়া ঘুমের কাব্য

ডেসপিক্যাবল ম্যাটার

আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা জরুরি যে কারণে