মাধ্যমিকের ফল বিপর্যয়: উত্তরণ কোন পথে?



গত ১০ জুলাই সারাদেশে মাধ্যমিক ও সমমানের ফল প্রকাশিত হয়েছে। এবারের মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৬৮.৪৫% পরীক্ষার্থী। ৬ লাখ ৬৬০ জন পরীক্ষার্থীই হয়েছেন অকৃতকার্য।

বিগত বছরগুলোর মাধ্যমিকের ফলাফলগুলো তুলনায়, এই হার গত ১৮ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

কিন্তু লাখ লাখ শিক্ষার্থী কেন হঠাৎ করে এই ফল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন? এত বড় ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যের নিয়ামকগুলো কী? এই ফল বিপর্যয়ের দায় কাদের উপর বর্তায়? আর উত্তরণের সম্ভাব্য পথই-বা কোন দিকে— এ ধরনের নানা প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

বেশ কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে গড়ে ওঠা জিপিএ ফাইভ এবং পাসের হারের বাম্পার ফলনের সংস্কৃতি মাধ্যমিকের ফল নিয়ে যে হারে প্রত্যাশার বীজ সাধারণ জনগণের মনে রোপণ করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নগুলো ওঠাই স্বাভাবিক।

কেন এই সংকট?

মূলত, বিগত ১৮ বছরের মধ্যে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের এই ধস নামার পেছনে অনেকগুলো কারণই উল্লেখ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে, বিগত সরকারের আমলে দেশের শিক্ষাখাতের অগ্রযাত্রা দেখাতে যেমন কথিত ‘নম্বর প্রদানে উদারনীতি’-এর প্রসঙ্গ থাকতে পারে, তেমনই থাকতে পারে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার অবনমন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়মিত পাঠদানের বিষয়াদি।

এ ছাড়া, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অতি মাত্রায় স্মার্টফোন কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তির দিকগুলোও যুক্ত হতে পারে এই আলাপে।

কেননা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এর বিপরীতে—১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেয়েছেন। যদিও গত বছর আরও প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে জিপিএ ফাইভ অর্জন করেছিলেন। এরপরও দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের এক বিরাট অংশের ফল দেশের মানুষকে ভাবাচ্ছে।

বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন ৫৬.৩৮% পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বোর্ডটিতে খারাপ ফল হওয়ার কারণ খুঁজে আগামীতে ভালো ফল করার চেষ্টা চালানো হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বোর্ডটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. শহীদুল ইসলাম।

কিন্তু এই বিষয়ে আসলে কতটা গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।

নেপথ্যের নিয়ামকগুলো কী কী?

২০২৫ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাসের হার কমার বিষয়টি নিয়ে কথা হয় খুলনার সেন্ট জোসেফস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্বর্ণ কমল রায়ের সঙ্গে। স্বর্ণ কমল বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহাওয়ায় এবারের এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে আগের বছরগুলোর চেয়ে শিক্ষক, ম্যাজিস্ট্রেট ও কেন্দ্রসচিবেরা অধিক কঠোরতা দেখিয়েছেন।

এর পাশাপাশি, ওভারমার্কিং বা আন্ডারমার্কিংয়ের পরিবর্তে পরীক্ষকদের যথাযথভাবে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করতে উৎসাহ দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা অন্যায্য সুবিধা পাননি এবার। এ কারণেই পাসের হার কমেছে বলে মনে করেন তিনি।

একইভাবে বলা যায়, জুলাই আন্দোলনের কারণে দেশের স্কুলগুলোতে নিয়মিত পাঠদান ও শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বহু স্কুল শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনেও ব্যস্ত ছিলেন বেশ কিছুদিন। এ ছাড়া, রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের ভেতরে বহু শিক্ষার্থী ট্রমায় আক্রান্ত হন। সবমিলিয়ে এসবের প্রভাব গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ওপর।

অপর দিকে, শিক্ষার্থীদের বিশৃঙ্খল জীবনপ্রণালীও অনেক ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবারের মতো খারাপ ফল করার পেছনে নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। কেননা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অত্যধিক মাত্রায় ডিজিটাল ডিভাইস এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একাধিক সমীক্ষা ও গবেষণা বলছে, দেশের শহরগুলোতে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬৭% স্মার্টফোনে সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য বিনোদনের সাইটগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৩-৫ ঘণ্টা সময় অপচয় করছেন। এ ধরনের সাইটগুলোতে অশ্লীল এবং বিকৃত কনটেন্টও আছে ব্যাপক সংখ্যায়। ফলে স্বভাবতই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দূরে যাওয়ার পাশাপাশি নৈতিক ও মানসিক দিক হতেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আবার, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় উঠে আসে, দিনে চার ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলকভাবে অন্যান্যদের চেয়ে বেশি খারাপ হচ্ছে। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি থেকে তারা যেমন রাতে সময়মতো ঘুমাচ্ছেন না, তেমনি সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করছেন। এ ছাড়া, শারীরিক কসরত না করার কারণেও শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ায় স্কুলে অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছেন তারা।

দায় কার ওপর বর্তায়?

২০২৫ সালের মাধ্যমিকের ফলাফল বিপর্যয়ের দায় কখনোই এককভাবে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। অসচেতন অভিভাবক সমাজ, ব্যবসায়ী শিক্ষকশ্রেণি, বিতর্কিত খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি ছাড়াও আরও নানা বিষয় এই পরিস্থিতি সৃষ্টির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর গোটা বিশ্বেই শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম অনলাইনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে অভিভাবকেরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের হাতে তুলে দেন ডিজিটাল ডিভাইসসমূহ। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন বাদে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহারবিধি এবং নেতিবাচক দিকগুলো তদারকি করার প্রয়োজনীয়তা খুব কমই অনুভব করেছেন তারা।

নিজেদের পেশাগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত অভিভাবকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে তো এই চিত্র হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই ডিজিটাল ডিভাইসে বুঁদ হয়ে যান।

অন্য দিকে, আমাদের দেশের সেকেন্ডারি পর্যায়ের স্কুলগুলোর গুটিকয়েক শিক্ষক বাদে অধিকাংশরাই বাণিজ্যিক লক্ষ্যে প্রাইভেট কোচিং পড়িয়ে থাকেন স্কুলে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি। ফলে এই শ্রেণির শিক্ষকেরা দায়সারাভাবে স্কুলে পাঠদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে নিজের কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়ান তাদের বেতন স্কেল বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায়।

আবার, স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে নিজেদের কোচিংয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়ার মতোও অসাধু প্রবণতা লক্ষ করা যায় তাদের কারো কারো মাঝে। এ কারণেও সকল শিক্ষার্থীরা সমানভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ফলস্বরূপ ঘটে এমন ফল বিপর্যয়।

এর সঙ্গে সঙ্গে, বিগত বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত বিতর্কিত খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতির প্রসঙ্গেও সকলেই প্রশ্ন তুলছেন। তাই পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় এবার পাসের হার কম হলেও যথাযথ খাতা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় বিষয়টিকে ফল বিপর্যয় বলতে নারাজ হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন।

কারণ বিগত বছরগুলোতে অলিখিতভাবে পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনা থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পাসের হার এবং জিপিএ ফাইভপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা ও বৃহৎ প্রত্যাশার মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছিল।

কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিতে গিয়ে চান্স পাওয়া তো দূরের কথা, পাসও করতে পারতেন না সেই সব শিক্ষার্থীদের অনেকে। আর এ কারণেই উঠছে সেই বিতর্কিত ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন।

উত্তরণ কোন পথে?

সর্বোপরি, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে— এটি মেনে নেওয়া কষ্টকর। জুলাই আন্দোলনের পর বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে।

দেশের সর্বত্র নতুন বন্দোবস্ত এবং সংস্কার নিয়েও এখন বহু আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। নানা খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে গঠন করা হলেও, সেই তালিকায় নেই শিক্ষাঙ্গণ। এমতাবস্থায়, শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অগ্রগতি সাধনে দেশের অভিভাবক সমাজের মধ্যে বিদ্যমান অসচেতনতা, শিক্ষা-বাণিজ্যের ভয়াল থাবা এবং বিতর্কিত সকল ব্যবস্থা দূর করাই হলো একমাত্র উত্তরণের পথ।

অন্যথায়, নতুন বন্দোবস্ত ও সংস্কার নিয়ে যেসব কথাবার্তা এখন চলছে, তার সবই মাঠে মারা পড়বে। কেননা, হাজার হোক— শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড বলে একটা প্রবাদ এখনও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে।

লেখক: ফ্রিল্যান্সিং সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[এই লেখাটি ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই ‘দৈনিক খোলাকাগজ’ পত্রিকার মতামত শাখাতে প্রকাশিত হয়। এখানে প্রকাশিত সংস্করণটি ঈষৎ সম্পাদিত।]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উনো রিভার্স আর বুঁদ হওয়া ঘুমের কাব্য

ডেসপিক্যাবল ম্যাটার

আল মাহমুদ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা জরুরি যে কারণে